Blog By Mominul Huq sir

পরিভাষা কী ও কেন

‘পরিভাষা‘ কি পরিদের ভাষা ? অথবা, ভিনগ্রহীদের ভাষা ? পরিভাষা কী কাজে লাগে ? পরিভাষা কত প্রকারের ? এসব প্রশ্নেরই উত্তর আমরা এখানে খুঁজব।

‘পরিভাষা‘ হচ্ছে বিদেশি শব্দের বাংলা অনুবাদমূলক শব্দ ও শব্দগুচ্ছ । এগুলোর ইংরেজি প্রতিশব্দ- `Terminology` ।  পরিভাষারূপে গৃহীত ও স্বীকৃত শব্দই পারিভাষিক শব্দ- term বা technical term । রাজশেখর বসুর মতে- পরিভাষা অর্থ সংক্ষেপার্থ শব্দ । অর্থাৎ যে শব্দের দ্বারা  কোনো বিষয় সংক্ষেপে ও সুনির্দিষ্টভাবে ব্যক্ত করা যায়, তা পরিভাষা । যেমন- সাহিত্য (Literature), ব্যাকরণ (Grammar), অভিধান (Dictionary), বিজ্ঞান (Science), ভূগোল (Geography), মানচিত্র (Map) ।   

ভাষা ও পরিভাষা

পরি + ভাষা = পরিভাষা । এটি উপসর্গজাত শব্দ । কিন্তু ‘ভাষা‘ মৌলিক শব্দ । দৈনন্দিন ভাষা সাধারণ মানুষের সৃষ্টি । কিন্তু পরিভাষা মুষ্টিমেয় বিজ্ঞজনের সৃষ্টি । ভাষার সাহায্যে আমরা দৈনন্দিন কার্যাদি সম্পন্ন করি । পরিভাষা মূলত অনুবাদ ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় । অর্থাৎ পরিভাষার উৎস ও প্রয়োগক্ষেত্র আলাদা ।

সাধারণ শব্দ ও পারিভাষিক শব্দ

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত শব্দই সাধারণ শব্দ । এরূপ শব্দ দ্ব্যর্থবোধক হতে বাধা নেই । যেমন- ‘কৃষ্ণ‘ ব্যক্তি (শ্রীকৃষ্ণ) ও বর্ণবিশেষ । আবার ‘বর্ণ‘ শব্দটির অর্থ ‘রঙ‘ (colour) বা জাতি (cast, race) । কিন্তু দ্ব্যর্থবোধক নয়, বরং বিশেষ ও সুনির্দিষ্ট অর্থবোধক শব্দই পারিভাষিক শব্দ । যেমন- আইন (law), অণুবীক্ষণ যন্ত্র (microscope), খামার (farm), শিক্ষণ (teaching),  প্রশিক্ষণ (training) ।   

 সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত

বাংলা পরিভাষা সৃষ্টি ও চর্চার ইতিহাস মাত্র দু-শ বছরের । ভারতবর্ষে ব্রিটিশের রাজত্ব প্রতিষ্ঠার পরই ইংরেজি থেকে বাংলা পরিভাষা সৃষ্টির প্রয়োজন দেখা দেয় । এক্ষেত্রে প্রথমে কতিপয় ইংরেজ এবং পরে  স্বদেশি বিজ্ঞজনেরা উদ্যোগী হন । ইংরেজদের মধ্যে জনাথন ডানকান ও ফেলিক্স কেরি হচ্ছেন পথিকৃৎ । জনাথন ডানকান প্রমুখ লেখক ইংরেজি আইন বাংলায় অনুবাদ করেন । ফেলিক্স কেরি বাংলা পরিভাষা সৃষ্টি ও বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান-পুস্তক  রচনা করেন ।

স্বদেশিদের মধ্যে অক্ষয়কুমার দত্তের নাম সর্বাগ্রে স্মরণীয় । তিনি বাংলা পরিভাষা সৃষ্টি ও বিজ্ঞান-পুস্তক রচনা করে যশস্বী হন । এরপর রাজেন্দ্রলাল মিত্র, বিপিন বিহারী দাস, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, রাজশেখর বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ বাংলা পরিভাষা সৃষ্টিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন । তাছাড়া পরিভাষা সৃষ্টিতে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ (১৮৯৪), পরিভাষা সংসদ (১৯৪৮), বাংলা অ্যাকাডেমি (১৯৫৪)-সহ কতিপয় প্রতিষ্ঠান/সংগঠনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ।

প্রকারভেদ

পরিভাষা বিষয়ভিত্তিক। যথা- পদার্থবিজ্ঞান পরিভাষা, রসায়ন পরিভাষা, গণিত পরিভাষা, প্রাণিবিজ্ঞান পরিভাষা, উদ্ভিদবিজ্ঞান পরিভাষা। এগুলোকে একত্রে বলা যাক ‘বৈজ্ঞানিক পরিভাষা ’। বিষয়বস্তু অনুযায়ী পরিভাষা আরো বহু প্রকারের হতে পারে। যথা-  ক) শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট পরিভাষা,  খ) প্রশাসনিক পরিভাষা,  গ) বিচার-সম্পর্কীয় পরিভাষা,   ঘ) বাণিজ্যিক পরিভাষা, ঙ) ধর্মীয় পরিভাষা ।

পরিভাষা সৃষ্টির রীতি-পদ্ধতি

০১. কৃতঋণ শব্দ

ক. মূল শব্দ:

অক্সিজেন, কম্পিউটার, কার্টুন, কার্বন-ডাই অক্সাইড (কার্বন), ক্লিনিক, ক্যালকুলেটর, ক্যালেন্ডার, রেডিও, টেলিভিশন, টেলিফোন, ড্রাফট, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, রেফ্রিজারেটর (ফ্রিজ), হসপিটাল ইত্যাদি।

খ. কিছুটা পরিবর্তিত বা আত্মীকৃত শব্দ:

আরদালি (orderly), ইঞ্চি (inch), কাপ্তান (captain), টেবিল (table), ডাক্তার (doctor), জজ (judge), বাংলা (bungalow), বালাম (volume), বেয়ারা (bearer), পল্টন (platoon), হাসপাতাল (hospital) ইত্যাদি।

০২. অনুবাদমূলক শব্দ:  

ক. আক্ষরিক অনুবাদ

কালাজ্বর (black fever), ক্ষুদেবার্তা (sms), গণকযন্ত্র (calculator), বৃদ্ধাশ্রম (old home), মাঠকর্মী (Field worker), বিচারক (Judge), মৃত সাগর (dead sea), মোটরগাড়ি (motor-car), মুখচিত্র (faceart), রৌদ্রস্নান (sun-bath) সমীকরণ (equation), বাতিঘর (lighthouse) ইত্যাদি।

খ. ভাবানুবাদ

অম্লজান (Oxygen), উকিল (Advocate), উদরাময় (Diarrhea), খসড়া (Draft), জাল মুদ্রা (bad coin), জীবাণু (Bacteria), জীবাশ্ম (fossil), দূরালাপনী (Telephone), দপ্তর (Office), দূরদর্শন (television), পঞ্জিকা (Calendar), বিমানবালা (Air-hostess), বেতার (radio), ব্যঙ্গচিত্র (Cartoon), রঞ্জনরশ্মি (X-ray), সূর্যমুখী (sunflower) ইত্যাদি।

০৩. নতুন সৃষ্টি

মুঠোফোন (Mobile Phone)।

উল্লেখযোগ্য যে, পরিভাষা সংক্ষিপ্ত, সহজবোধ্য ও ব্যবহারযোগ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। তাছাড়া পরিভাষা সৃষ্টি ও ব্যবহার একটি চলমান প্রক্রিয়া । গ্রহণ-বর্জনের মাধ্যমে পরিভাষা যুগোপযোগী হয়ে ওঠে ।

Tags: No tags

Comments are closed.